শিক্ষা ও ক্যাম্পাস

জিপিএ-৫ অর্জন, ডিসির কাছে অভিযোগ নয়—সাদিয়া যেত পড়া দিতে

সাদিয়া আফরিন জিপিএ-৫ পাওয়ার পর দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে
জিপিএ-৫ পাওয়ার পর দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে সাদিয়া আফরিন। ছবি: সংগৃহীত

সাধারণত জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে মানুষ নানা অভিযোগ ও সমস্যা নিয়ে আসেন। তবে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক শিক্ষার্থীর যাতায়াত ছিল একটু ভিন্ন কারণে। অর্থসহায়তার আবেদন নিয়ে সেখানে যাওয়া সাদিয়া আফরিনকে জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম শুধু আর্থিক সহায়তা দেননি, নিয়মিত পড়াশোনার দায়িত্বও নিয়েছিলেন।

প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত পড়া শেষ করে সাদিয়া হাজির হতো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সেখানে গণশুনানির ব্যস্ততার মধ্যেই জেলা প্রশাসক তার পড়া শুনতেন, ভুলগুলো ধরিয়ে দিতেন এবং পরের সপ্তাহের পড়া ঠিক করে দিতেন। এভাবে সপ্তাহ থেকে মাস, মাস থেকে প্রায় এক বছর কেটে যায়।

এর ফলও এসেছে। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সাদিয়া। তার বিদ্যালয় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে এবার ৪৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। পাস করেছে ২২ জন। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়াই জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।

আর্থিক সহায়তার আবেদন থেকে শুরু

দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া আফরিনের বাবা মো. সেলিম একটি চালকলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মা আরফা বেগম সংসারের কাজের পাশাপাশি সেলাই করে আয় করেন। তিন মেয়ের মধ্যে সাদিয়া বড়।

সংসারের সীমিত আয়ে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় গত বছরের জুলাইয়ে সাদিয়ার পড়াশোনার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন তার মা।

পরে সাদিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। সেদিন জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম সাদিয়ার পড়াশোনা সম্পর্কে জানতে চান। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সাদিয়া বেশ কিছু প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।

তখন জেলা প্রশাসক তাকে একটি চ্যালেঞ্জ দেন। তাৎক্ষণিকভাবে শুধু টাকা দিয়ে বিদায় না করে সাত দিনের পড়া নির্ধারণ করে দেন। পাশাপাশি প্রতিদিনের পড়াশোনার একটি রুটিনও তৈরি করে দেন।

বুধবারের নিয়মিত যাত্রা

জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন রাতে দুই ঘণ্টা এবং ভোরে দুই ঘণ্টা পড়াশোনা করার কথা ছিল সাদিয়ার। রাত ১০টায় ঘুমানো, ভোর ৫টায় ওঠা এবং বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলার সময়ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। স্কুলে ক্লাস থাকুক বা না থাকুক, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় তাকে।

প্রতি বুধবার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে আগের সপ্তাহের পড়া বুঝিয়ে দিতে হতো সাদিয়াকে। এরপর নতুন পড়া নিয়ে বাড়ি ফিরত সে।

এভাবেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়টি সাদিয়ার জন্য এক ধরনের দ্বিতীয় পাঠশালায় পরিণত হয়। মানুষের অভিযোগ শোনার পাশাপাশি সেখানে চলত এক শিক্ষার্থীর পড়াশোনারও মূল্যায়ন।

জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সাদিয়াকে সাত হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।

পড়ার টেবিলও ছিল না

সাদিয়াদের বাড়ির আর্থিক সংকট শুধু পড়াশোনার খরচেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাসিমপুর সরকারপাড়ার বাড়িটিতে নেই আলাদা পড়ার ঘর, এমনকি একটি পড়ার টেবিলও নেই।

সরু পথ পেরিয়ে টিনের ছাপরার সেই বাড়িতে পৌঁছাতে হয়। প্রায় দুই শতক জমির ওপর থাকা ঘরটি বেড়া দিয়ে দুই ভাগ করা। এক পাশে বাবা-মা ও ছোট বোনের থাকার জায়গা, অন্য পাশে সাদিয়া ও তার মেঝ বোনের।

আলমারির ওপর রাখা বইপত্রই ছিল তার পড়াশোনার প্রধান সঙ্গী। কখনো বিছানায়, আবার কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়াশোনা করেছে সাদিয়া।

ভয়কে জয় করে এগিয়ে যাওয়া

জেলা প্রশাসকের কাছে নিয়মিত পড়া দিতে প্রথম দিকে ভয় পেত সাদিয়া। কিন্তু সেই ভয় ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসে বদলে যায়।

সাদিয়ার ভাষায়, প্রথম দিকে স্যারের কাছে পড়া দিতে ভয় লাগত। তবে নিয়মিত পড়াগুলো করার চেষ্টা করত সে। জেলা প্রশাসকের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি উৎসাহ ও সাহসও তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলীও সাদিয়ার সাফল্যে আনন্দিত। তাঁর ভাষ্য, সাদিয়া বিদ্যালয়টির একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী। জেলা প্রশাসক বিভিন্ন সময়ে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ক্লাসও নিয়েছেন। সাদিয়াকে তিনি নিজের মেয়ের মতো দেখতেন বলে জানান প্রধান শিক্ষক।

‘ওর মধ্যে আগ্রহ আছে’

সাদিয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, প্রথম দিন কথা বলেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সাদিয়ার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তাই তাকে একটি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল। সাদিয়াও নিয়ম মেনে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পড়াশোনা করেছে।

জেলা প্রশাসক মনে করেন, সাদিয়ার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও সহায়তার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। দিনাজপুরের বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি এমন অনেক শিক্ষার্থীর কথা জানতে পেরেছেন।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত দেড় বছরে কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষা সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবছর নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সামনে আরও বড় স্বপ্ন

জিপিএ-৫ পাওয়ার পর সাদিয়ার স্বপ্ন আরও বড় হয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যেতে চায় সে। নিজের পরিবারের অভাব দূর করার পাশাপাশি মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে চায়।

তবে মেয়ের সাফল্যে আনন্দের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত তার বাবা মো. সেলিম। মেয়েটি আরও পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু সেই পড়াশোনার ব্যয় কতটা বহন করতে পারবেন—এ নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে তাঁর।

তবু সাদিয়ার গল্পটি শুধু একটি জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়। সীমিত সুযোগ, অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও একজন শিক্ষার্থীকে নিয়মিত পড়াশোনা ও উৎসাহের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া যায়—দিনাজপুরের এই ঘটনা তারই একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো
মূল প্রতিবেদন: প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি পড়ুন

btimes desk