ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পশ্চিম পাইকপাড়া এলাকায় একটি হোটেল ও মন্দিরের জায়গা দখলের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে আবারও আলোচনায় এসেছে রামকানাই দত্তের সম্পত্তির মালিকানার বিষয়টি।
শহরের কালাশ্রীপাড়ার মৃত মোজাফফর আহমেদের ছেলে মোস্তাক আহমেদ ও ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে জায়গা দখল ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে সুমন চন্দ্র দাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডি নম্বর ৭৭৬।
এই অভিযোগের পর আবারও আলোচনায় এসেছে দানবীর খেত রামকানাই দত্তের নাম ও তাঁর সম্পত্তির মালিকানা। দোপাবাড়ি হিসেবে পরিচিত যে জায়গায় এখন ‘আমুই হোটেল’ ও একটি ব্রাহ্ম মন্দির রয়েছে, সেই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে রয়েছে বহু পুরোনো বিরোধ। নথি ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এই জমি নিয়ে রয়েছে পুরোনো বিনিময় দলিল, উত্তরাধিকারীদের দাবি এবং প্রশাসনিক পর্যায়ের আগের সিদ্ধান্তের নথি।
মোস্তাক আহমেদ-গংয়ের দাবি, তাঁরা ক্রয় সূত্রে ওই সম্পত্তির মালিক। সুমন পক্ষের দাবি, জায়গাটির মূল মালিক ছিলেন রামকানাই দত্ত এবং তাঁর আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) সূত্রে সুমন চন্দ্র দাস জায়গাটির সম্পত্তি-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, বিনিময় দলিল-সংশ্লিষ্ট পরিবারের ওয়ারিশদের দাবি, রামকানাই দত্ত সম্পত্তিটি বিক্রি করেননি; বরং আইনসম্মতভাবে তাঁদের পরিবারের জমির সঙ্গে বিনিময় দলিল করেছিলেন, যার মাধ্যমে তাঁরা ওই সম্পত্তির মালিক হন। আবার সম্পত্তিটির মালিকানা সরকারি ভূমি-সংক্রান্ত নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশের নথিও পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ, বর্তমান বিরোধের প্রশ্ন শুধু কে এখন জায়গাটি দখল করে আছেন—সেটি নয়; বরং জমিটির প্রকৃত মালিকানা কীভাবে বদলেছে, কারা প্রকৃত মালিক—সেই ইতিহাসই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সুমনের অভিযোগ
সাধারণ ডায়েরিতে সুমন চন্দ্র দাস অভিযোগ করেন, গত ১১ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে মোস্তাক আহমেদ ও ইমতিয়াজ কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে পশ্চিম পাইকপাড়ার ওই জায়গায় যান।
জিডিতে বলা হয়, এ সময় হোটেলের ভাড়াটিয়া রুহুল আমিন সেলিমকে দ্রুত হোটেল ছেড়ে দিতে এবং সুমনকে মামলা তুলে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিতে চাপ দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে তাঁকে ও তাঁর ভাড়াটিয়াদের ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে জায়গা না ছাড়লে প্রাণনাশ ও জোরপূর্বক দখলের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
জিডি অনুযায়ী, পশ্চিম পাইকপাড়ার ওই জায়গায় প্রায় ১৮ শতাংশ জমির ওপর ‘আমুই হোটেল’ ও একটি ব্রাহ্ম মন্দির রয়েছে। জায়গাটি নিয়ে মোস্তাক আহমেদ ও ইমতিয়াজের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে বলেও জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোস্তাক আহমেদ ও ইমতিয়াজের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
জমিটির ইতিহাসে রামকানাই দত্ত
বর্তমান বিরোধের জায়গাটির মালিকানা ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দানবীর খেত রামকানাই দত্তের নাম। কারণ, সম্পত্তিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরোনো নথিতে তাঁর নাম এবং একটি বিনিময় দলিলের তথ্য পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য অনুযায়ী, রামকানাই দত্তের সঙ্গে একটি পরিবারের জমি বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয়টি দলিলে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমান জিডিতে যে জায়গার পরিমাণ প্রায় ১৮ শতাংশ বলা হয়েছে, তবে সম্পত্তিটির বিনিময় দলিলে জমির পরিমাণ ২৫ শতক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
ফলে বর্তমান বিরোধের জায়গার সঙ্গে ওই পুরোনো বিনিময় দলিলের সম্পর্ক কী এবং পরবর্তী সময়ে সম্পত্তিটির মালিকানা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
বিক্রি নয়, বিনিময় হয়েছিল—ওয়ারিশদের দাবি
বিনিময় দলিল-সংশ্লিষ্ট পরিবারের ওয়ারিশদের দাবি, রামকানাই দত্ত ওই সম্পত্তি বিক্রি করেননি। বরং তাঁদের পরিবারের জমির সঙ্গে আইনসম্মতভাবে সম্পত্তি বিনিময় করেছিলেন।
ওয়ারিশদের দাবি, সেই বিনিময় দলিলের মাধ্যমেই তাঁদের পরিবারের কাছে সম্পত্তিটির মালিকানা আসে। সংশ্লিষ্ট পরিবারের কয়েকজন ওয়ারিশ এখনো জীবিত রয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগও করেছেন বলে জানা গেছে।
ফলে কয়েক দশক আগের ওই বিনিময় দলিল এখন শুধু একটি পুরোনো নথি নয়; বর্তমান মালিকানা বিরোধের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে সামনে এসেছে।
তবে ওই বিনিময় দলিলের পরবর্তী সময়ে সম্পত্তিটির ভূমি রেকর্ড কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং কার নামে রেকর্ড হয়েছে—সেটিও মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো প্রশাসনিক নথিতেও সম্পত্তির উল্লেখ
বিনিময় দলিলের পাশাপাশি রামকানাই দত্তের এই সম্পত্তি নিয়ে পূর্ববর্তী একটি প্রশাসনিক ও ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমের নথিও পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট নথিতে সম্পত্তিটির মালিকানা সরকারি ভূমি-সংক্রান্ত নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশের উল্লেখ রয়েছে।
এই নথির কারণে সম্পত্তিটির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ইতিহাস আরও পুরোনো বলে প্রতীয়মান হয়। তবে ওই সিদ্ধান্তের পর তা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং পরবর্তী ভূমি রেকর্ডে এর কী প্রভাব পড়েছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মালিকানা নিয়ে তিন ধরনের দাবি
একদিকে মোস্তাক আহমেদ-গংয়ের দাবি, তাঁরা ক্রয় সূত্রে ওই সম্পত্তির মালিক। অন্যদিকে সুমন পক্ষ রামকানাই দত্তের মালিকানা ও আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে সম্পত্তি-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের কথা বলছে।
এর বাইরে বিনিময় দলিল-সংশ্লিষ্ট পরিবারের ওয়ারিশদের দাবি, সম্পত্তিটি বিক্রির মাধ্যমে নয়, বরং বিনিময় দলিলের মাধ্যমে তাঁদের পরিবারের কাছে এসেছিল।
ফলে একই সম্পত্তি নিয়ে সামনে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন মালিকানা-সংক্রান্ত দাবি। এক পক্ষের দাবি ক্রয় সূত্রে মালিকানা, অন্য পক্ষের দাবি রামকানাই দত্তের মালিকানা ও আমমোক্তারনামা, আর বিনিময় দলিল-সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশদের দাবি পুরোনো বিনিময় দলিলের ভিত্তিতে তাঁদের মালিকানা।
এখন এসব দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলিল, ভূমি রেকর্ড, উত্তরাধিকার এবং প্রশাসনিক নথির ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখাই হয়ে উঠেছে মূল বিষয়।
কয়েক দশকের নথিতে যে প্রশ্ন
পশ্চিম পাইকপাড়ার এই জায়গা নিয়ে বর্তমান বিরোধ তাই শুধু দখল কিংবা প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশক আগের সম্পত্তি বিনিময়, উত্তরাধিকার, পরবর্তী মালিকানা দাবি এবং সরকারি ভূমি-সংক্রান্ত নথি।
প্রশ্ন হলো—রামকানাই দত্তের সঙ্গে সম্পত্তির বিনিময় কীভাবে হয়েছিল, সেই বিনিময়ের পর কারা উত্তরাধিকারী হয়েছেন, পরবর্তী সময়ে সম্পত্তিটির মালিকানা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং বর্তমান ভূমি রেকর্ড সেই ইতিহাসের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থাৎ, বর্তমান বিরোধের সমাধান শুধু জায়গাটি বর্তমানে কার দখলে রয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং পুরোনো দলিল থেকে বর্তমান ভূমি রেকর্ড পর্যন্ত মালিকানার পুরো ধারাবাহিকতা যাচাই করেই বিষয়টি বোঝা সম্ভব।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া টাইমস বিডি
নোট: প্রতিবেদনে উল্লেখিত দখল, হুমকি ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিষয় সংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগ, বক্তব্য ও প্রাপ্ত নথির ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগ ও দাবির চূড়ান্ত সত্যতা এবং সম্পত্তির মালিকানা-সংক্রান্ত আইনগত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আদালতের সিদ্ধান্তসাপেক্ষ।

