মতামত
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশে প্রায় দুই বছর ধরে অপেক্ষায় ছিল ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীস্তম্ভ। নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট ২০২৬) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ প্রধান অতিথি হিসেবে এর উদ্বোধন করেন।
এখন থেকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এই স্থাপনাটিতে রয়েছে জাদুঘর, ১৮টি দোকান, রেস্তোরাঁ, শিশুপার্ক, পানির ফোয়ারাসহ নানা আয়োজন।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর দরজা খুলেছে—এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু এখানেই শেষ নয়; বরং শুরু হয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। প্রশ্ন এখন, ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনাকে কীভাবে একটি কার্যকর ইতিহাস, শিক্ষা, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত করা যায়?
২০১৭ সালে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় কয়েক ধাপে বেড়ে শেষ পর্যন্ত ৭২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। নির্মাণ শেষ হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু নির্মাণ শেষ হলেও এটি খোলা হয়নি সঙ্গে সঙ্গে—কারণটি শুধু আমলাতান্ত্রিক নয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছিল এই ভারতীয় মিত্রবাহিনীকে উৎসর্গ করা স্থাপনার ভাগ্যেও। প্রায় দুই বছর এটি পড়ে ছিল অব্যবহৃত অবস্থায়, ধুলাবালি ও অযত্নে ধীরে ধীরে বিবর্ণ হতে হতে।
এই পটভূমি মনে রাখা জরুরি—কারণ এটি শুধু একটি অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, একটি রাজনৈতিক-কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িত। আজ সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে বলে স্তম্ভটি খুলে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আবার টানাপোড়েনের মধ্যে পড়লে এই স্থাপনার কার্যক্রম যেন আবার থমকে না যায়, সে বিষয়েও একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান দরকার। একটি জাতীয় স্মৃতিস্থাপনা কূটনৈতিক আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত নয়—বরং এটি পরিচালিত হওয়া উচিত একটি স্থায়ী, রাজনীতি-নিরপেক্ষ কাঠামোর মধ্য দিয়ে।
মৈত্রীস্তম্ভকে শুধু একটি পার্ক বা দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচালনা করলে এর সম্ভাবনার বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাবে। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ এবং বাংলাদেশ–ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক।
এই স্থাপনাকে কার্যকর করতে হলে প্রথমেই এটিকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিক্ষা ও ইতিহাসচর্চার একটি জীবন্ত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। ঢাকার লিবারেশন ওয়ার মিউজিয়াম এক্ষেত্রে একটি কার্যকর মডেল হতে পারে—সেখানে নিয়মিত শিক্ষা সফর, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও গবেষণা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি স্মৃতিস্থাপনাকে জীবন্ত রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। আশুগঞ্জের জাদুঘরটিকেও একইভাবে স্কুল-কলেজের নিয়মিত শিক্ষা সফর, মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময়, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং স্থানীয় ইতিহাসের দলিল সংরক্ষণের কেন্দ্রে পরিণত করা যায়। পার্থক্য শুধু এখানে—ঢাকার মতো কেন্দ্রীয় অবস্থানের সুবিধা আশুগঞ্জের নেই, তাই স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় প্রচার আর প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ (জেলা শিক্ষা অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ) ছাড়া এই মডেল এখানে আপনাআপনি কাজ করবে না।
অন্যদিকে, ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশে এর অবস্থান একটি বড় সুবিধা। প্রতিদিন এই মহাসড়ক দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। সঠিক প্রচার, পার্কিং, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। আশুগঞ্জের মেঘনা নদী, নদীবন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যুক্ত করে ভবিষ্যতে একটি পর্যটন সার্কিটও তৈরি করা সম্ভব। এতে শুধু মৈত্রীস্তম্ভের দর্শনার্থী বাড়বে না, স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।
১৮টি দোকান ও রেস্তোরাঁও এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অংশ। এগুলো কীভাবে বরাদ্দ ও পরিচালনা করা হবে, সেটি স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও তরুণদের সুযোগ দেওয়া গেলে প্রকল্পটি স্থানীয় অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখতে পারে। দোকানগুলোতে স্থানীয় খাবার, ঐতিহ্যবাহী পণ্য, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই ও স্মারক বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম যেন মৈত্রীস্তম্ভের মূল পরিচয়কে ছাপিয়ে না যায়—এ বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রক্ষণাবেক্ষণ—এবং এটি নিছক আশঙ্কা নয়, ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া বাস্তবতা। উদ্বোধনের আগেই আশপাশের চাতালকলের কালো ধোঁয়া ও মহাসড়কের ধুলাবালিতে স্মৃতিস্তম্ভের দেয়াল-ভাস্কর্য বিবর্ণ হতে শুরু করেছিল। পরিবেশ অধিদপ্তর প্রায় এক বছর আগে চাতালকলগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য চিঠি দিলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। এই একটি অমীমাংসিত সমস্যাই বলে দেয়, শুধু স্থাপনা তৈরি করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না—আশপাশের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোটি টাকার এই বিনিয়োগ কয়েক বছরেই আবার জীর্ণ হয়ে পড়তে পারে।
উদ্বোধনের দিন মানুষের ভিড় তৈরি করা সহজ; কিন্তু পাঁচ, দশ কিংবা বিশ বছর পরও মানুষকে এখানে টেনে আনা কঠিন। আর এখানেই ৭২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের আসল পরীক্ষা।
১৬ কোটি থেকে ৭২ কোটি টাকায় পৌঁছানো এই প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির হিসাব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্থাপনাটি যেহেতু এখন বাস্তবে দাঁড়িয়ে গেছে এবং সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে, সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই বিনিয়োগ থেকে জনগণ কী পাবে?
একজন শিক্ষার্থী পাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার সুযোগ। একজন গবেষক পাবে তথ্য ও স্মৃতির উপাদান। একজন পর্যটক পাবে নতুন একটি গন্তব্য। একজন স্থানীয় উদ্যোক্তা পেতে পারেন ব্যবসার সুযোগ। আর রাষ্ট্র পেতে পারে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—যদি এটি পরিচালিত হয় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে।
১৩ আগস্টের উদ্বোধনের মাধ্যমে মৈত্রীস্তম্ভের দরজা খুলেছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এর যাত্রা এখনই শুরু। এখন প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থাপনা, যাতে এটি কয়েক বছর পর আবার আরেকটি অব্যবহৃত সরকারি স্থাপনায় পরিণত না হয়। বরং নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী, শিক্ষা সফর, গবেষণা, পর্যটন কার্যক্রম এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জায়গাটিকে একটি জীবন্ত জনসম্পদে পরিণত করা যায়।
শেষ পর্যন্ত মৈত্রীস্তম্ভের সাফল্য নির্ধারিত হবে তার নির্মাণ ব্যয়ে নয়, উদ্বোধনের আয়োজনেও নয়—মানুষের জীবনে ও ইতিহাসচর্চায় এটি কতটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারে, তার ওপর।
৭২ কোটি টাকার এই বিনিয়োগকে তাই এখন একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—মৈত্রীস্তম্ভ কি শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ হয়েই থাকবে, নাকি হয়ে উঠবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাস, শিক্ষা, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির একটি জীবন্ত কেন্দ্র?
- লেখক: সাংবাদিক
