রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রুমীন ফারহানার তিন প্রশ্ন—আর জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক।
বিশ্লেষণ||
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমীন ফারহানা বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি। ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে যে ছয়জন ভোটদানে বিরত ছিলেন, তিনি তাঁদের একজন। তবে তাঁর ভোট না দেওয়ার গুরুত্ব শুধু একজন সংসদ সদস্যের ভোটদানে বিরত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্বের একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে তাঁর অবস্থান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে সন্ধ্যায় দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুমীন ফারহানা ভোট না দেওয়ার তিনটি কারণ তুলে ধরেন। পরে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকেও সাক্ষাৎকারটি শেয়ার করা হয়।
যে তিনটি প্রশ্ন তুলেছেন রুমীন
প্রথমত, নির্বাচনের প্রকৃত অর্থ নিয়ে প্রশ্ন। ফলাফলের সম্ভাব্য চিত্র যদি ভোটের আগেই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সেটিকে প্রকৃত অর্থে কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বলা যায়—এই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, ফলাফল নিয়ে বাস্তবিক কোনো অনিশ্চয়তা না থাকলে সেটিকে নির্বাচন না বলে বরং ‘মনোনয়ন’ বলাই বেশি যথাযথ।
দ্বিতীয়ত, একটি হারানো সুযোগ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিপুল আত্মত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি পদে একজন অরাজনৈতিক ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন রুমীন। তাঁর প্রশ্ন—সেই সুযোগ কাজে লাগানো হলো না কেন?
তাঁর কাছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একজন প্রার্থী বেছে নেওয়ার বিষয় ছিল না; বরং এটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দৃষ্টান্ত তৈরির সুযোগও হতে পারত। রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে ঐকমত্য তৈরি করা গেলে সেটি জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির জন্য একটি ভিন্ন বার্তা দিতে পারত।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। রুমীন ফারহানার বক্তব্যে এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিএনপি ২০১৬ সাল থেকে নিজেদের ‘ভিশন ২০৩০’-এ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের কথা বলে আসছে। অথচ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের পদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে—এমন অবস্থান জানানো হয়েছে। রুমীনের মতে, এটি বিএনপির দীর্ঘদিনের ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই জায়গা থেকেই তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করে ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
ব্যক্তিগত প্রতিবাদ, নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্ন?
রুমীন ফারহানার ভোট বর্জনকে শুধু একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মিল কতটা—এই প্রশ্নও তাঁর অবস্থানের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য কি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজের বিবেক ও রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী ভোট দেওয়ার মতো স্বাধীনতা রাখেন?
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এই বিধান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কারণ দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংসদ সদস্যের ভোটের সম্পর্ক সরাসরি তাঁর রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যদি রাজনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেই সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হতে পারে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ও স্বাধীনতা। সেই জায়গা থেকেই রুমীনের প্রশ্নটি শুধু একটি নির্বাচনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি রাজনৈতিক দল, সংসদ সদস্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
জুলাইয়ের প্রত্যাশা বনাম বর্তমান বাস্তবতা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; রাষ্ট্র ও রাজনীতির পরিচালন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসবে—এমন একটি আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই পরিবর্তনের একটি প্রতীকী সুযোগ হতে পারত। একজন অরাজনৈতিক, সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা গেলে সেটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বার্তা দিতে পারত। একইভাবে, সংসদ সদস্যদের নিজস্ব বিবেচনায় ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটিও রাজনৈতিক সংস্কারের ভিন্ন একটি দৃষ্টান্ত হতে পারত।
কিন্তু বাস্তবতা যদি আবারও দলীয় সিদ্ধান্ত, সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত থাকার ধারণার মধ্যেই আটকে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—পরিবর্তনটি ঠিক কোথায়?
অবশ্য রুমীন ফারহানার অবস্থানই যে জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির একমাত্র ব্যাখ্যা, তা নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তাঁর আপত্তির সঙ্গে একমত না হওয়ারও সুযোগ আছে। কিন্তু তাঁর ভোট বর্জন অন্তত এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হয়েছে। এখন প্রশ্ন—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হলো?
কারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত; কিন্তু শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণ হয়?



