একটি ছবি, ‘খাসি কাণ্ডের নতুন বউ’ তকমা—আর তার সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে একজন মেয়ের সারাজীবনের পরিচয়। একজন প্রবাসীর বিয়েকে ঘিরে শতাধিক সংবাদ, প্রশ্ন উঠছে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়েও।
বিশ্লেষণ |
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার আলোচিত ‘খাসি কাণ্ড’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মূলধারার সংবাদ মাধ্যম—সবখানেই কনটেন্টের জোয়ার বয়ে গেছে। আগের বিয়ে ভাঙা নিয়ে নানা বিতর্কের পর ওই প্রবাসী সম্প্রতি বিয়ে করেছেন। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে শতাধিক সংবাদ—’বউ কে’, ‘বিয়েতে খাসি ছিল কি না’, ‘কীভাবে বিয়ে হলো’।
একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন বা বিয়ে নিয়ে এত সংবাদের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, সে প্রশ্ন তো রয়েছেই; তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্বহীনতার জায়গাটি অন্যখানে। অধিকাংশ সংবাদে প্রকাশ করা হয়েছে নতুন বউয়ের ছবি। অথচ আগের কোনো বিতর্কের সঙ্গেই যার দূরতম সম্পৃক্ততা ছিল না, সেই নিরপরাধ মেয়েটিকে এই দায়িত্বহীনতার খেসারত দিতে হতে পারে সারা জীবন।

দায়িত্বহীনতা কোথায়?
আগের বিয়ে ভাঙার ঘটনায় এই মেয়েটির কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি কোনো বক্তব্য দেননি, সিদ্ধান্ত নেননি, বা কোনো বিতর্কেও জড়াননি। অথচ তার ছবি জনসমক্ষে প্রকাশ করে তাকে জোর করে এই ‘ভাইরাল গল্পে’র চরিত্র বানিয়ে দেওয়া হলো। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাহীন একজন মানুষকে চটকদার সংবাদের অনুষঙ্গ বানানো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার লক্ষণ হতে পারে না।
সাইবার ট্রোলিং ও সামাজিক সুরক্ষা
ছবি প্রকাশের পর সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ধাপটি হলো সাইবার ট্রোলিং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের ছবি মুহূর্তেই কটূক্তি ও হাসাহাসির উপাদানে পরিণত হয়। মন্তব্যের ঘরে চলে অনুমাননির্ভর চর্চা ও হয়রানি। সংবাদের কাজ তথ্য দেওয়া, কারও ব্যক্তিগত জীবনকে সস্তা বিনোদনের খোরাক বানানো নয়।
দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ঝুঁকি
একটি মেয়ের ছবি প্রকাশ করা মানে কেবল তার চেহারা দেখানো নয়—এর সঙ্গে যুক্ত থাকে তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র। ছবিটি যখন ‘খাসি কাণ্ডের নতুন বউ’ তকমার সঙ্গে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সে একজন স্বাধীন মানুষ থেকে একটি খণ্ডিত ঘটনার চিরস্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়।
ইন্টারনেটের কোনো তথ্য বা ছবি সহজে মুছে যায় না। কয়েক বছর পর ভিন্ন কোনো পরিবেশে বা কর্মক্ষেত্রে গিয়েও তাকে এই অযাচিত পরিচয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে। স্বজনেরাও এ সামাজিক চাপ থেকে মুক্ত থাকবেন না। আজ যে ঘটনা নিয়ে ট্রোল হচ্ছে, কাল তা মেয়েটির পরিবারের জন্য এক অস্বস্তিকর সামাজিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
ফেসবুক পোস্ট বনাম সংবাদমাধ্যমের নীতি
অনেকে যুক্তি দিতে পারেন—ছবিটি তো ওই প্রবাসী নিজেই ফেসবুকে দিয়েছেন। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট আর একটি নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যমের পৌঁছানোর ক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা এক নয়। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য সার্চ ইঞ্জিনে স্থায়ী ডিজিটাল রেকর্ড হয়ে থাকে। প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘প্রকাশের অনুমতি আছে কি না’ নয়, বরং ‘প্রকাশের প্রয়োজন আছে কি না’।
এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে চটুল সাংবাদিকতা বা সেন্সেশনালিজমের স্বরূপ। মূল ঘটনা প্রকাশের পর একই খবর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বারবার প্রকাশ করা কোনো জনস্বার্থ মেটায় না; বরং তা কেবল ক্লিক ও ভিউ পাওয়ার লোভ। পাঠকের কৌতূহল আর প্রকৃত ‘জনস্বার্থ’ এক জিনিস নয়।
নিউজওয়ার্থিনেস বনাম ক্ষতি
সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালায় একটি বড় প্রশ্ন হলো—কোনো তথ্য সংবাদযোগ্য হলেও তা প্রকাশ করলে কারও সম্ভাব্য ক্ষতি কতটা হতে পারে? মেয়েটি কোনো আইনি অপরাধের শিকার নন, তাই হয়তো ছবি প্রকাশ সরাসরি আইনত দণ্ডনীয় নয়। কিন্তু নারী ও শিশুদের পরিচয় সুরক্ষায় আইন যে সতর্কতা অবলম্বন করে, তার মূল শিক্ষাটি মানবিক—পরিচিতি প্রকাশ যেন কারও ভবিষ্যৎ ধ্বংস না করে। এখানে ছবিটি প্রকাশ না করা অথবা অন্তত মুখ আবছা (ব্লার) রাখাই হতে পারত সঠিক সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত।
যেকোনো তকমার বাইরে গিয়ে সেই মেয়ে হোক বা ছেলে বা যেকোনো লিঙ্গ বা বয়সের একজন স্বাধীন মানুষের— নিজস্ব সত্তা, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের কাজ মানুষের চটুল আগ্রহ মেটানো হতে পারে না , নিরপরাধ মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করাও তার প্রাতিষ্ঠানিক অন্যতম দায়িত্ব।



