অর্থনীতি ও বাণিজ্য

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস: জাতীয় জ্বালানি আর অর্থনীতি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া | অর্থনীতির

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন এবং জাতীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে কয়েক দশক ধরে যুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্র। মাটির নিচের এই প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের জ্বালানি ও অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

১৯৬২ সালে আবিষ্কারের পর তিতাস থেকে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে এই গ্যাসক্ষেত্র পরোক্ষভাবে উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

তিতাস থেকে কত গ্যাস আসছে?

২০২৬ সালের এপ্রিলের সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৭টি কূপের মধ্যে ২২টি থেকে গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩৩৩.৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে।

এর অর্থ, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিদিন তিতাস থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় গ্যাস যুক্ত হচ্ছে। আর এই গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে।

গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ থেকে শিল্প

গ্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারগুলোর একটি হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ফলে গ্যাসের সরবরাহের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ এর একটি বড় উদাহরণ। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি সার কারখানাও রয়েছে। ফলে তিতাসের মতো দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গেও যুক্ত।

একটি সহজ উদাহরণে বিষয়টি বোঝা যায়—গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, সেই বিদ্যুৎ দিয়ে কারখানা চলে; আবার গ্যাস সরাসরি কিছু শিল্পের উৎপাদনেও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ গ্যাসের সরবরাহ কমলে তার প্রভাব অর্থনীতির একাধিক স্তরে পড়তে পারে।

কৃষির সঙ্গেও সম্পর্ক

গ্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার সার উৎপাদনে। আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় সার উৎপাদনের সঙ্গে তিতাসসহ দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্ত।

২০২৬ সালের এপ্রিলের সংসদীয় আলোচনায়ও আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, সার কারখানায় গ্যাস দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।

এখানেই দেশের গ্যাস অর্থনীতির একটি বড় বাস্তবতা সামনে আসে—একই গ্যাস কখনো বিদ্যুৎ উৎপাদনে, কখনো শিল্পে, আবার কখনো কৃষির জন্য সার উৎপাদনে ব্যবহার করতে হয়।

পুরোনো তিতাস, নতুন বিনিয়োগ

তিতাস পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র হলেও এর সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং উৎপাদন ধরে রাখতে নতুন কূপ খনন ও গভীর অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ খননের কাজ শুরু হয়। এটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করা হয়েছিল।

এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তিতাসে আরও একটি গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ শুরু হয়। তিতাস-৩১ নামের এই কূপটি প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা রয়েছে। সফল হলে এখান থেকেও দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

কেন তিতাসের গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি করা LNG-এর ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। তাই দেশের মাটির নিচ থেকে যত বেশি গ্যাস পাওয়া যায়, তা জ্বালানি সরবরাহের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ছিল ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে বলে সংসদে জানানো হয়।

এই পরিস্থিতিতে তিতাসের মতো পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খনন, বিদ্যমান কূপের উৎপাদন ধরে রাখা এবং নতুন গ্যাসের সন্ধান—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে

তিতাসের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু কত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এই গ্যাসের সঙ্গে যুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন, পরিবহন, প্রকৌশল, ঠিকাদারি ও বিভিন্ন সেবা খাত। ফলে তিতাসের উৎপাদন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করেছে।

একদিকে তিতাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ; অন্যদিকে এর গ্যাস জাতীয় গ্রিডে গিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসের গল্প আসলে একটি গ্যাসক্ষেত্রের গল্পের চেয়ে বড়। এটি দেখায়, একটি জেলার মাটির নিচের সম্পদ কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শিল্প, কৃষি থেকে ব্যবসা—দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

আর তিতাসে নতুন কূপ ও গভীর অনুসন্ধানের বর্তমান উদ্যোগ বলছে, এই সম্পদের গুরুত্ব এখনো শেষ হয়নি; বরং কমতে থাকা দেশীয় গ্যাসের সময়ে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

তথ্যসূত্র: পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (BGFCL), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) ও The Business Standard।

btimes feature