২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঐতিহ্য ও ইতিহাস

তিতাসের বুকে নৌকাবাইচ, বৈঠার ছন্দে মুখর ব্রাহ্মণবাড়িয়া

তিতাস নদীতে অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৌকাবাইচ
তিতাস নদীতে নৌকাবাইচ দেখতে দুই পাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে আবারও দেখা গেল রঙিন নৌকার সারি। বৈঠার ছন্দে এগিয়ে চলা নৌকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুই পাড়ে জমেছিল মানুষের ভিড়। দীর্ঘ দুই বছর পর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ফিরে আসা নৌকাবাইচ ঘিরে শনিবার তিতাসের পাড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।

লাল, হলুদসহ নানা রঙের নৌকা নদীর পানি কেটে এগিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিযোগিতা যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে দর্শকদের উচ্ছ্বাস। একটি নৌকা সামান্য এগিয়ে গেলে অন্য নৌকার মাঝিরা আরও জোরে বৈঠা চালিয়ে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেছেন।

তিতাসের দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে এই প্রতিযোগিতা দেখেছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। নদীর ওপরও ছিল দর্শনার্থীদের নৌকা। সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য তিতাসের এই অংশটি পরিণত হয় একটি বড় জনসমাগমে।

দুই বছর পর ফিরল নৌকাবাইচ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে দুই বছর বিরতির পর এবারের আয়োজন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আগে থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। জেলা প্রশাসন ২৪ আগস্টের প্রস্তুতিমূলক সভায় ১২ সেপ্টেম্বর নৌকাবাইচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।

আয়োজনের আগে নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। দর্শনার্থীদের নৌকায় উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার ও নাচানাচি না করার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। নদীতে দুর্ঘটনা এড়ানো এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

প্রতিযোগিতায় যারা এগিয়ে

এবারের নৌকাবাইচে প্রথম স্থান অর্জন করে সরাইলের শাপলা বয়েজ ক্লাব। দ্বিতীয় হয় চাঁনপুর হাজীবাড়ি নৌকা মজলিস, মজলিশপুর ইউনিয়ন। আর তৃতীয় স্থান অর্জন করে নবীনগর উপজেলা দল

প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে যথাক্রমে ২ লাখ, ১ লাখ ৫০ হাজার এবং ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অন্যান্য দলকেও দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার টাকা করে প্রাইজমানি

নদী, মানুষ আর পুরোনো এক উৎসব

বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নৌকাবাইচের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। নদীমাতৃক ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও তিতাসকে ঘিরে এই আয়োজন বহু মানুষের কাছে শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং সামাজিক মিলনমেলার অংশ।

নৌকাবাইচের সময় নদীর দুই পাড়ে মানুষের ভিড় এবং পানিতে দর্শনার্থীদের নৌকার উপস্থিতি সেই চিত্রটিই সামনে আনে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন আয়োজনের বিরতি থাকায় এবারের নৌকাবাইচ স্থানীয়দের কাছে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।

অনুষ্ঠানে ছিলেন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা

নৌকাবাইচ ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল

বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ

দুই বছর পর তিতাসের বুকে ফিরে আসা এই আয়োজন তাই শুধু নৌকার প্রতিযোগিতা নয়। কয়েক ঘণ্টার জন্য এটি নদীর সঙ্গে মানুষের পুরোনো সম্পর্ক, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং একসঙ্গে উৎসব করার অভিজ্ঞতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

তিতাসের স্রোতে নৌকা হয়তো কিছুক্ষণ পর থেমে গেছে। কিন্তু নদীর দুই পাড়ে জমে থাকা মানুষের উচ্ছ্বাসে আবারও দৃশ্যমান হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই চেনা নদীকেন্দ্রিক উৎসবের ছবি।